বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৫:২৭ পূর্বাহ্ন
জহিরুল ইসলাম:
মধ্যপ্রাচ্যের বহু দিনের ছায়াযুদ্ধ এখন সরাসরি সামরিক সংঘাতে রূপ নিয়েছে। আধুনিক এই রাষ্ট্রযুদ্ধে পরিস্কার বিজয় বিড়ল হয়ে দাড়িয়েছে। একদিকে ইরান অন্যদিকে ইসরায়েল আর পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইসরায়েলের রয়েছে অত্যাধনিক বিমান শক্তি ও ক্ষেপনাশস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যাবস্থা। অন্যদিকে ইরানের রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তি। সরাসরি এই যুদ্ধক্ষেত্রে আকাশে ড্রোন,দুরপাল্লার ক্ষেপনাস্ত্র. সাইবার হামলা সব মিলিয়ে দ্রুত পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। সরাসরি এই যুদ্ধক্ষেত্রে উভয়পক্ষই আঘাত করে এর পরিপেক্ষিতে যুদ্ধ দীর্ঘ হবে আর এই যুদ্ধ ক্ষয়যুদ্ধে পরিনিত হবে। সম্ভবত এই ক্ষয় যুদ্ধে কেউ চুরান্ত জয় পাবেনা। শেষপ্রর্যন্ত কুটনৈতিক গোল টেবিলে সমাধান খুচতে হবে। অবশেষে সাময়িক বিজয়েরে চাইতে রাজনৈতিক সমাঝোতাই বেশি প্রধান্য পাবে। তবে এখন প্রশ্ন হলো এই যুদ্ধ কতদিন চলবে? ইরানের সুগঠিত শাসনব্যবস্থাই দেশটিকে যুদ্ধে টিকিয়ে রাখবে। কারণ, দেশটির প্রশাসনিক গঠন এমনভাবে সাজানো, যেখানো কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতাবলয় নেই। প্রতিটি স্তরেই ক্ষমতার ভিন্ন ভিন্ন কেন্দ্র সক্রিয়।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ইরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন করতেই এই যুদ্ধ পরিচালনা করছে। কিন্তু ইরানের শাসনব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে কঠিন পরিস্থিতিতেও টিকে থাকে। এই অবস্থায় শুরু হওয়া যুদ্ধ সহজেই থামবে না। যে কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলার করার মধ্য দিয়ে সংঘাত শুরু হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। ইরানের পাল্টা হামলায় গোটা উপসাগরীয় অঞ্চল অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে। ইসরায়েলের অগণিত বিমান হামলায় পর্যুদস্ত হচ্ছে তেহরান। ইরানও পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ে জবাব দিচ্ছে।
মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার পর জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিবেশী আরব দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনায় তেহরানের প্রতিশোধমূলক হামলা আবারও গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে যুদ্ধে নিমজ্জিত করেছে। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু বলেছেন, তাদের লক্ষ্য ইরানে একটি অনুকূল শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন আনা।
তবে এ কথা সত্য, খামেনি হত্যাকাণ্ড ইসলামী শাসনব্যবস্থার জন্য একটি উল্লেখযোগ্য আঘাত, তবুও এটি অপ্রতিরোধ্য নয়। অতীতে অনেক ইরানি নেতা নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা স্থপতি কাসেম সোলাইমানির মতো জাঁদরেল নেতাও রয়েছেন। সোলাইমানিকে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে হত্যা করেছিলেন এই ট্রাম্পই। কিন্তু তাদের প্রতিস্থাপন তুলনামূলকভাবে সহজেই সম্পন্ন হয়েছিল। এ কারণেই ইসলামী শাসনব্যবস্থা টিকে থাকে বছরের পর বছর।
খামেনির বিদায়ের মানে এই নয়, ইসলামী শাসনব্যবস্থার শিগগির অবসান ঘটবে। এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে খামেনি আগেই সবকিছু ঠিক করে রেখেছিলেন। তাঁর উত্তরসূরি কারা হবে, তা তিনি স্পষ্ট করে গেছেন।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু ইরানি জনগণকে দেশটির শাসনতন্ত্রকে উৎখাত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের টার্গেট দেশটির ৩০ বছরের কম বয়সী নাগরিক, যারা চলতি বছরের শুরুতে বিক্ষোভে নেতৃত্ব দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, ইরানি নাগরিকদের একটি অংশ শাসনব্যবস্থায় ক্ষুব্ধ। তারাই ওই বিক্ষোভে নেমেছিল। কিন্তু সরকার কঠোর হাতে তাদের দমন করে। বিক্ষোভে হাজার হাজার মানুষ নিহতও হয়।

খামেনি নিহত হওয়ার পর সেই বিক্ষোভ কি আবার দেখা দেবে এমন প্রশ্ন উঠেছে। কোনো পক্ষ আবারও বিদ্রোহ শুরু করতে পারে সেই অপেক্ষায় রয়েছে পশ্চিমা শক্তি। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এমন কোনো শঙ্কা নেই। বরং দেশটির জনগণ সরকারকেই দৃঢ় সমর্থন দিচ্ছে। এখন প্রশ্ন কি হবে এই যুদ্ধের ফলাফল
১. কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক চাপ ও মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি।
২. হামলা-পাল্টা হামলার মধ্য দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী সীমিত সংঘাত ও অনিশ্চয়তা অব্যাহত।
৩. অন্য রাষ্ট্র বা গোষ্ঠী সরাসরি যুক্ত হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে যা আঞ্চলিক ভাবে বিস্তার করবে।
এই যুদ্ধের সহজ উত্তর নেই। স্পষ্ট বিজয়ীর সম্ভাবনা ক্ষীণ বরং মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতিই বেশি দৃশ্যমান। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন রয়ে যায় বন্দুকের নল থেকে কি শান্তি আসবে, নাকি আলোচনার টেবিলেই খুঁজতে হবে স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ?